রেখো মা দাসেরে মনে

মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্ম:২৫ জানুয়ারি ১৮২৪-মৃত্যু : ২৯ জুন ১৮৭৩
— রফিকউল্লাহ খান
খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার মোহে যে বাঙালি মনীষার যৌবনোচ্ছল অনুভূতিতে অনুরণিত হয়েছিল দূরগামী আটলান্টিকের তরঙ্গধ্বনি; জাতীয় জীবনের উপনিবেশপীড়িত, অবরুদ্ধ মানসশক্তির পুনর্জাগরণ কামনায় যিনি অভিযাত্রিক হিসেবে তরণী ভাসিয়েছিলেন প্রাচ্য-প্রতীচ্যের বন্দরে বন্দরে, ওডেসিয়ুসের মতো; তিনিই এক সময় ইউরোপীয় শিল্প-সাহিত্যের রত্নসম্ভার বোঝাই জাহাজ নিয়ে নোঙর করলেন বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। বঙ্গজননীর সাংস্কৃতিক দারিদ্র্যে ম্রিয়মাণ ললাটে পরিয়ে দিলেন আধুনিকতার রত্ন-অলংকার। জাতীয় অস্তিত্বের হতাশাগ্রস্ত, পরাভববেদনায় অবগুণ্ঠিত চেতনার বেদীমূলে প্রজ্বলিত করলেন অত্মশক্তির বহ্নিজ্বালা। পরাধীন ভারতের প্রথম গণজাগরণ সিপাহি বিদ্রোহের (১৮৫৭) ব্যর্থতাবোধজনিত অতল যন্ত্রণাসাগরে তরঙ্গিত করলেন দ্রোহচেতনার অনত্দর্লীন স্রোতধারা। স্বর্ণলঙ্কার অতুল বৈভব ও স্বজন বিসর্জনের বেদনায় বিলাপরত রাবণের মধ্য দিয়ে প্রতীকায়িত করলেন বাঙালি জীবনের ঐশ্বর্যময় অতীত, স্বপ্নময় অথচ বিনষ্ট বর্তমান এবং সমাজ ও ব্যক্তি অস্তিত্বের আবহমান ট্রাজিক ঘটনাপ্রবাহ। জাতীয় জীবনের ব্যর্থতা ও ক্ষোভ, অচরিতার্থতা ও যন্ত্রণা এবং শক্তি ও সম্ভাবনার এই মহান রূপকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃতু্যদিবস ২৯ জুন। আমাদের জীবনের আঙিনা দিয়ে অনেকটা সন্তর্পণেই চলে গেল এই দিন, অন্যান্য বছরের মতো।
এ ভূখণ্ডেরই এক অংশে, যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ খিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন মধুসূদন দত্ত। বাঙালির সামগ্রিক জীবনোপলব্ধি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিচেতনার গতিশীল রূপান্তরে তাঁর যে ভূমিকা – তাতে এই দিনটিকে বাঙালির জাতীয়ভাবে স্মরণ করার কথা। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃতু্ বরণ করেন এই ক্ষণজন্মা মনীষী। আনুষ্ঠানিকতার কথা না হয় বাদই দিলাম, বাঙালির ঋণ-স্বীকার ও মূল্যায়নের প্রকৃতিও হতাশাব্যঞ্জক। তাঁর কৃতি ও কীর্তি মহাকালের ললাটে অক্ষয় হয়ে থাকবে সন্দেহ নেই, কিন্তু আমাদের আত্ম-বিশ্লেষণের জন্য এই দৃষ্টান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিপ্রতিভার মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যত না স্বীকৃতি থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি থাকে আত্ম-আবিষ্কার ও আত্মোপলব্ধির আলোক শিখা। যে মহান বাঙালি প্রথম আধুনিক উচ্চারণে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বিশ্বজনীন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শিখিয়েছিলেন জাতিকে, যাঁর সৃজনী প্রতিভার স্পর্শে সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই পেয়েছিল অপরিমেয় প্রাণশক্তি – উনিশ শতকীয় বাঙালি মনীষার সেই মহান রূপকার আজ কি কেবলই গ্রন্থবন্দি? অথবা সমাধিফলকে লিপিবদ্ধ ‘ দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব/ বঙ্গে! তিষ্ট ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে’ ধ্বনিপুঞ্জের মূর্ছনায় শিহরিত, আপ্লুত, ভারাক্রান্ত আবেগের আঙ্গিনায়ই তার একমাত্র আবেদন? বাঙালির চরিত্রগত এই অসঙ্গতি যেন আগেই উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলেন মাইকেল মধুসূদন, অনেকটা ভবিষ্যদ্রষ্টা পরম পুরুষের মতো। ১৮৬২ সালে রচিত এক কবিতায় কবির সম্বোধন
ও আবেদনের অভীষ্ট কিন্তু কোন মানুষ কিংবা মানুষী নয়, বঙ্গভূমি _ কবির সত্তালালিত শিল্পের উপনিবেশ, যাকে চেতনায় ধারণ করেই তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের উদ্দেশে। ব্রিটিশের বস্তুগত উপনিবেশের মধ্যে তিনি নিমান করেছিলেন এক চেতনাগত ‘বঙ্গভূমি’। তাঁর প্রত্যাশা ও আরাধনার লক্ষ্যও সেই বাংলা মাতা :
রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে।
সাধিতে মনের সাদ,
ঘটে যদি পরমাদ,
মধুহীন করো না গো তব মনঃককোনদে।
কী আকুল এবং বিনীত এই উচ্চারণ! যেখানে নেই মননের সেই নিগূঢ় অনুসন্ধানস্পৃহা, বিশ্ব ঐতিহ্যের গহন অরণ্যে শিল্পের উৎস আবিষ্কারের অদম্য কৌতূহল; নেই উনিশ শতকীয় নকজাগ্রত তারুণ্যের অপরিমেয় স্বপ্ন-কল্পনা; এবং ব্যক্তির প্রতীকে অবরুদ্ধ মানবতার আর্তনাদ। আছে, কেবল প্রত্যাশা; বিশ্বচারী বাঙালি কবির মাতৃভূমি, স্বদেশ ও জাতিসত্তার প্রতি ঐকান্তিক অঙ্গীকার; তার স্বীকৃতির প্রতি অসীম আস্থা। এবং সংশয় :
সেই ধন্য নরকূলে
লোকে যারে নাহি ভূলে
মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন;_
কিন্তু কোন গুণ আছে
যাচিব যে তব কাছে
হেন অমরতা আমি, ………………..!
২
প্রথম জীবনে নিজ জন্মভূমি, বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবল অনীহা জন্মেছিল মধুসূদনের মনে। সেই ‘অনীহা’ যে আত্যন্তিক ভালোবাসারই অন্যতর রূপ, তা পরে আমরা বুঝতে পারি। মধ্যযুগীয় মূল্যবোধ-অনুসৃত প্রচলিত শিল্প-সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারেনি মধুসূদনের বিদ্রোহী মন। উল্লেখ্য যে, সাত বছর বয়স পর্যনত্দ মধুসূদনের মানসভিত্তি গড়ে উঠেছিল, বাংলার নিভৃত পল্লী যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। তারপর কলকাতায় এসে দেখলেন ব্রিটিশ-উপনিবেশিত কলকাতার মধ্যবিত্তের বামন চেহারা এবং বিকলাঙ্গ রূপ। এর আগে দেখেছিলেন জরাজীর্ণ গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতি। তাঁর কৈশোর-যৌবনের পরিমণ্ডল তৈরী হয়েছিল এক দল দ্রোহী, শিক্ষিত ও স্বপ্নময় তারুণ্যের বলয়ে। বাল্য বয়সে মা জাহ্নবী দেবীর কাছে লোকায়ত রামায়ণ-মহাভারত শ্রবণের পাশাপাশি লোকজীবন, সংস্কৃতি এবং অপর ভাষা ফারসি শিক্ষার সূত্রপাত তাঁর মানসগড়নে গভীর প্রভাব রেখেছিল। যৌবনে প্রাচ্য-প্রতীেেচ্যর ঐতিহ্য ও শিল্পের গভীর অনুধ্যানলালিত মন সমকালীন বাংলার জীবন ও সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারে নি। এজন্য তাঁর উদ্দাম তারুণ্য একদিকে যেমন তীব্র অনীহা প্রকাশ করেছে স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি, তেমনি, অন্যদিকে, সত্তার গভীরে লালন করেছে বর্তমানের বিচিত্র অসঙ্গতি মোচনের অপরিমেয় স্বপ্নাবেগ। এর ফলে, বিশ্বসংস্কৃতি ও শিল্পের বিচিত্র পথ-পরিক্রমায় মধুসূদনের পরিভ্রমণ হয়ে ওঠে উনিশ শতকীয় বাঙালি জীবনের নবজাগ্রত বাসনায় তরঙ্গিত, স্পন্দিত। ( চলবে)


প্রবন্ধটি অসাধারণ হয়েছে । মন্তব্য করতে ভয়-ই পাচ্ছি। মধুকবিকে জানতে চাই।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে জানতে হলে তাঁর রচনাবলি পড়ুন। নতুন দৃষ্টি দিয়ে তাঁকে বিচার করুন।