মৃত হুমায়ুন আজাদ জীবিত সংস্কৃতি
— নজরুল ইসলাম কিরণ
“মানুষ মরলে লাশ হয়, সংস্কৃতি মরলে প্রথা হয়”।
_ এই মৃত সংস্কৃতি তথা প্রথার বাইরে গিয়ে একটি সুস্থ্য, সচল সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন হুমায়ুন আজাদ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অবদান নিয়ে কথা বলার মত দুঃসাহস আমার নেই, কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তার মত পন্ডিত আর যে খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য সে বিষয় আমার কোন সন্দেহ বা মতভেদ নেই। বাংলা ভাষা বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্বের ছাপ পাওয়া যায় তাঁর গদ্যে। সহজ, সরল এবং মধুমাখা তাঁর সব গদ্য যেন মহুয়া’র মাদকতায় পূর্ণ। তাঁর উপন্যাস, প্রবন্ধ এমনকি কবিতায় ভাষা গতিময় এব প্রাঞ্জল। তাঁর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য পড়তে গিয়ে মনে হয় সম্পূর্ণ’ই নতুন কিছু। অসাধারণ তাঁর স্বাদ। অপূর্ব তাঁর গতিময় ছন্দ। বৈশাখের ঝড়ো হাওয়ার মতো প্রচন্ডতায় দোল খায়। কিন্তু অঙ্কুরিত মুকুলটিও যেন বিধ্বস্ত হয় না। তাঁর সকল রচনায় তিনি যেন ভাষা নিয়ে মেতে উঠেছিল অসাধারণ এক কাব্যিক খেলায়। যে খেলায় প্রতিপক্ষ তথা প্রতিক্রিয়াশীলদের করেছেন ক্রুদ্ধ এবং পেয়েছেন জয়ের আনন্দ।
বহুমাত্রিক লেখক ভাষাবিজ্ঞানী ডঃ হুমাযুন আজাদের বিচরণের গতিবিধিতে সীমাবদ্ধতা থাকলেও_তাঁর
চিন্তার জগৎটি ছিলো সম্পূর্ণ স্বাধীন, মুক্ত এবং অসীম। তাঁর চিন্তা তাঁকে নিয়ে গেছে প্রচলিত প্রথাবদ্ধ সমাজ-সংস্কারের বাইরে একটি সম্পূর্ণ মৌলিক অবস্থানে। আর এ মৌলিকত্ব তথা তাঁর প্রথাবিরোধী দর্শনের সন্ধান পাওয়ার জন্য তাঁর হৃদয় নিংড়ানো বাণীর আস্বাদ পাওয়ার জন্য। যদি কেউ তাঁর প্রবচনগুচ্ছের স্মরণাপন্ন হয়, তবে সে তৃপ্ত হবে তাতে সন্দেহ থাকে না।
প্রবচনগুচ্ছ প্রথম সংকলিত হয় ফেব্রুয়ারি ১৯৯২-এ। তারও পূর্বে ১৯৮৯ সালের মে মাসে অরুনিমায় পঁচিশটি প্রবচন ছাপা হলে প্রতিক্রিয়াশীলদের মাথায় খুন চড়ে। শুরু হয় তাদের অস্ত্র শাঁনানো। তথাকথিত সব্যসাচী লেখক যাকে হুমায়ুন আজাদ পর্নোঅপন্যাসিক হিসেবে মূল্যায়ন না করে পারতেন না _ সেই সৈয়দ হক সহ কতিপয় ভন্ড প্রগতিশীলদের আক্রমনে পড়তে হলো তাঁকে। কিন্তু কোনো সমালোচনাই তাঁকে থামাতে পারে নি, গতিরোধ করতে পারে নি তাঁর কলমের। প্রায় দু’শটি প্রবচন সমন্বয়ের হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ তাঁর প্রমান।
হুমায়ুন আজাদ তাঁর ৫১ নম্বর প্রবচনে লিখেছেন _
“আর পঞ্চাশ বছর পর আমাকেও ওরা দেবতা বানাবে; আমার বিরুদ্ধে কোনো নতুন প্রতিভা কথা বললে ওরা তাকে ফাঁসিতে ঝোলাবে”।
পৃথিবীর কাছে পঞ্চাশ বছর বেশি সময় নয়। পঞ্চাশ বছর সময়ের ব্যাবধানে এই সমাজ সভ্যতায় কেউ হয়ে উঠতে পারে পুজ্য, আবার সেই হতে পারে ত্যাজ্য। মাত্র পঞ্চাশটি বছর পূর্বে জন্ম নিয়েও বেঁচে থাকতে পারেন নি হুমায়ুন আজাদ। তাই হয়তো তিনি বলেছিলেন _
“আমি ভুল সময়ে জন্মেছিলাম, তখনও আমার সময় আসেনি। আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে”।
আমরা অনেকেই হুমায়ুন আজদের সাহসের প্রশংসা করি। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অনেকেই তাঁর সাহসের প্রশংসা করে থাকেন। আমিই শুনেছি অনেকের মুখে। কিন্তু তারা পছন্দ করে আল মাহমুদ-ফরাদ মাজাহারদের। যে নামটি উচ্চারণেও থাকে আমার আপত্তি। এবং ঐ সব অথর্ব মানুষের সম্পর্কে বলতে গিয়েই তিনি বলেছেন _
“মানুষ সিংহের প্রশংসা করে, কিন্তু আসলে গাধাকেই পছন্দ করে”।
তাঁর ৩১ নম্বর প্রবচনটিতে বাংলাদেশ শীর্ষক রাষ্ট্র যন্ত্রটির প্রতারণার কথা বলতে গিয়ে মার্কসবাদের চরমে পেঁৗছেনেন। বাঙালি যে কতকটা অধিকারহীনতায় ভোগে তার আভাস পাওয়া যায় তাঁর এ প্রবচনটিতে।
_ “বেতন বাংলাদেশে এক রাষ্ট্রীয় প্রতারণা। এক মাস খাঁটিয়ে এখানে পাঁচ দিনের পারিশ্রমিক দেয়া হয়”।
একটি উগ্রবাদী মহল, যারা মৌলবাদ নামে পরিচিত হুমায়ুন আজাদকে তারা বলেছেন নাস্তিক হুমাযুন আজাদ প্রচলিত প্রথার বাইরে গিয়ে তাঁর একটি নিজস্ব দর্শনের চর্চা করতে চেয়েছেন। তিনি তো ধর্মের বিরুদ্ধে বলেন নি। তিনি নিজেকে কোনো ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধও করেন নি। তিনি নিজেকে মুক্ত রাখতে চেয়েছে মৃত সংস্কতি থেকে এবং পঁচা নোংড়া সংস্কৃতির ব্যাধিগুলো চিহ্নিত করে নির্মূলের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর পাঠককে বলেন নি যে, তোমরা ধর্ম মানবে না। অথবা ধর্ম হলো ভন্ডামো। তিনি বলেছেন তাদের কথা যারা ধর্মকে ব্যবহার করে ভন্ডামো করার জন্য, প্রতারণা করার জন্য। তাদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিলো সোচ্চার। তিনি বলেছেন _
“যারা ধর্মের বৈজ্ঞানীক ব্যাখ্যা দেয়, তারা ধার্মিকও নয়, বিজ্ঞানীও নয়। শুরুতেই স্বর্গ থেকে যাকে বিতাড়িত করা হয়েছিলো, তারা তার বংশধর”।
তিনি আরও বলেছেন যে, মসজিদে মন্দির ভাঙা-গড়ার মধ্যে কোনো ধর্ম নেই, রয়েছে রাজনীতি। কিন্তু তথাকথিত ধার্মিকেরা একে ধর্মের নামে চালায়। ঐ সব ধার্মিকদের বিপক্ষে গিয়ে তাদের নোংরামোর কথা বললে যদি নাস্তিক হতে হয়। যদি তাদের আক্রমনে হয় – তবে ঐ ধার্মিকদের মূর্খতার পর্যায়টি সম্পর্কে আর সন্দেহ থাকে না। এক্ষেত্রে আমার মনে পড়ছে মহামানব মুহাম্মদ (স) কে। যাকে মুসলমানরা পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে। বিশ্ব-মানবতার মুক্তির দূত মুহাম্মদ (স) যে কত বড় প্রথাবিরোধী ছিলেন তা যদি ঐ মূর্খ ধার্মিকেরা বুঝে উঠতে পারতো – তবে ওরা তাঁর সমাধিতে বোমা মারত। তৎকালীন আরবের প্রচলিত সব প্রথার বিরুদ্ধে গিয়ে একটি নতুন দর্শনের চর্চা শুরু করলেন। তিনি সেই সব কপোটদের বিরুদ্ধে বাণী উচ্চারণ করলেন – যারা মূর্তি পূজাকে ধর্ম হিসেবে ব্যবহার করতো এমনকি কন্যা-বলীকে মনে করত এক পূর্ণ্যময় ধর্ম-কর্ম। এই সব মৃত সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে সুস্থ্য সুন্দর সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে মুহাম্মদ (স) কে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করতে হয়েছে। জর্জরিত হতে হয়েছে নানা আক্রমনে। শুনতে হয়েছে নানা অপবাদ। এমনি বিধমর্ী হিসেবেও তাঁর অবস্খান তৈরি হয়। কেননা তিনি ছিলেন পৌত্তলিকতা তথা প্রচলিত ধর্ম বিরোধী। কিন্তু বাঙালির মূর্খতা ও ভন্ডামো অত্যন্ত ভয়াবহ ও সাংঘাতিক হওয়ায় প্রাণ দিতে হয় আজাদদের। সঈদীদের মতো সাংঘাতিক ব্যক্তিদের হাতে ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয় তখন সে ধর্ম হয়ে ওঠে মানবতার পরিপন্থি। আর সাঈদীরা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি তথা প্রগতি হন্তারক। যার ফলে প্রাণ দিতে হয় আজাদদের।
হুমায়ুন আজাদ যার হাতে ছিলো না কোনো অত্যাধুনিক মারনাস্ত্র। ছিলো না ধারালো চাপাতি। হঁ্যা ধারালো বটে; তাঁর হাতের কলমটি মৌলবাদের চাপাতির চেয়ে কম ধারালো নয়। কিন্তু সে ধার মানবতাকে হত্যা করার জন্য নয়। মানবতাকে তথা প্রগতিকে ্এগিয়ে রনয়ার জন্যে। হুমায়ুন আজাদ তাঁর কলম দিয়ে চিন্তাকে লিপিতে রূপ দিতেন। তাতে যদি কারও বা কোনো মহলের মুখোশটি খসে পড়ে। তাদের বিকারগ্রস্থতা, ভন্ডামো তথা নোংরামোর প্রকাশ ঘটেই যায়, কারও স্বার্থে যদি ব্যাঘাত ঘটেই থাকে তবে সে বা তারা কলম দিয়ে তার উত্তর দিতে পারতো। কিন্তু তা না করে যখন তারা হাতে নেয় মারনাস্ত্র, হত্যা করে আজাদকে-তখন যেন বিশ্ব মানবতাই অাঁৎকে ওঠে তাদের অশ্লীল আক্রমনের মুখে। ঘাতকরা আবারও প্রমান করে তাদের মূর্খতা কতটা মারাত্মক, কতটা ক্ষতিকর।
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ বারটি ছিলো শুক্রুবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম বড় আশা নিয়ে হুমায়ুন আজাদের ছাত্র হবো। কিন্তু মৌলবাদী জঙ্গীরা যে সকল সুন্দর স্বপ্নকে শ্মশানে পাঠাতে ভালবাসে (যদিও ভালবাসা শব্দটি ওদের জন্য নয়)। বাংলা একাডেমির বই মেলা থেকে ফিরছিলেন সক্রেটিস। সক্রেটিস বলায় অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারে, এমনকি আজাদও। কারণ তিনি নিজেকে কারও মতো মনে করতে পারতেন না। তিনি নিজেকে মনে করতেন পর্বত। যে পর্বতের চূড়ায় কারও পক্ষে আরোহন করা সম্ভব নয়। একটি স্বভাবগত মিলের কারণে আমি আজাদকে সক্রেটিস বলতে পছন্দ করি। আর তা হলো তরুণদের সাথে আড্ডা দেয়া। তিনি তরুণদের গুরুত্ব দিতেন সবচেয়ে বেশি। এই তরুণপ্রেমী আজাদ সেদিন বই মেলা থেকে হেঁটে হেঁটে আসছিলেন। পথমধ্যে আক্রান্ত হন অন্ধকারে ওঁৎ পেতে থাকা জঙ্গীদের আক্রমনে। সে বিভৎস চিত্র আমি দেখিনি।
শত ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ততার পথ বেঁয়ে অনেকটা সুস্থ্য হয়ে দেশে ফিরলেন আজাদ। মনে আবার আশার সঞ্চার হলো, হয়তো তাকে পাবো। দেখা হবে, কথা হবে। কিন্তু মৌলবাদীতা এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠল যে বাঁচতে পারলো না আজাদ। ২০০৪ সালে আগস্ট-এ হুমাযুন আজাদ গিয়েছিলেন জার্মানের পেন ক্লাবের আমন্ত্রণে। সুদূর মিউনিযে তিনি হারাণ তাঁর ভালোলাগার প্রিয় বিষয় জীবন। হুমায়ুন আজাদ হয়ে পড়েন মৃত। গতিচ্যুৎ হয়ে পড়ে একটি দর্শনের পথচলা থাকে আমরা বলে থাকি আজাদীয় দর্শন। যে দর্শনের ধারক এবং বাহক হিসেবে পথ চলতে শুরু করেছে হুমায়ুন আজাদ সংসদ। আজাদীয় চেতনায় উজ্জীবিত সকলের প্রতি রইল আহ্বান _ আসুন আমরা মৌলবাদকে না বলি, আজাদীয় চেতনাকে লালন করে ছড়িয়ে দেই বিশ্বমানবতার লক্ষ্যে।


Excellent writing sir. I have taken the article for Munshigonj.com and given the source name respectably.
চমৎকার! এবার নেম, মেইল, ওয়েবসাইট- এই লেখাগুলো বাংলা করে দিন। আর মন্তব্য প্রকাশ করুন লেখাটি উপরের লাইনের সাথে এক লাইনে দিয়ে দিন…