বাউল শিরমনি ফকির লালন শাহ্
— নজরুল ইসলাম কিরণ
যতদূর জানা যায়, বাউল শিরমনি ফকির লালন শাহ্ ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে কুষ্টিয়া জেলার গড়াই তীরবতর্ী ভানাড়া গ্রামের এক হিন্দু কায়েস্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। আবার কেউ কেউ বলেন তাঁর জন্মস্থান যশোরের হরিষপুর এবং তিনি মুসলমান। অবশ্য লালনের জন্মস্থান ও জাতি, ধর্ম নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এই মরমি সাধক যে বাংলাদশের বহু শতাব্দি বাহিত ইতিহাস ঐতিহ্যের এক পরম আধ্যাত্মিক কবিপুরুষ এ নিয়ে কোন সন্দেহ বা বিতর্ক নেই। লালন শাহ্ আখড়া স্থাপন করেছিলেন কুষ্টিয়া শহর সংলগ্ন ছেঁ্বওরিয়া গ্রামে। তিনি জীবিত ছিলেন দীর্ঘ একশত সতের বৎসর। এই সুদীর্ঘ জীবৎকালে যে অসংখ্য গান কথায় ও সুরে বেঁধেছেন, তাঁর হৃদয় ও সাধনা নিঃসৃত সেই গান আজ বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় সংগীত ধারা। গভীর আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পের ব্যঞ্জনাবাহী গানের আবেদন আজ সর্বত্র ব্যপ্ত। সহজিয়া প্রাণের বিস্তার ও অকুন্ঠ মানব প্রেম সমৃদ্ধ এ লালন গিতি, বলাই বাহুল্য-আমাদের এমন এক মহান উত্তরাধিকার যে আলো নিয়ে বাংলা ভাষাভাষি সকল মানুষের অন্তর প্রতি মুহূর্তে নানা বর্ণে ও নানা রঙে উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত।
জাতি-ধর্ম-সংস্কার-এর আক্রমনে আক্রান্ত লালন জাতিচ্যুৎ হলেন বটে কিন্তু সন্ধান পেলেন এক মহান মানবতাবাদের। যৌবনে যে অদম্য উৎসাহ আর আকাঙ্ক্ষার টানে সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন পুরিধামে-মহাপ্রভূর আকর্ষণে। কৃষ্ণ প্রেমিক সেই লালনের মুক্তি ঘটে সাঁই সিরাজের হাত ধরে। ঘরে স্ত্রী, মা, ওদিকে কৃষ্ণের আহ্বান – এ দোলাচলবৃত্তি সংকটের অবসান ঘটিয়ে মানব প্রেমের অমর বাণীকে হৃদয় নিংড়ানো সুরে বেঁধে দিয়ে পথ ধরেন – বাউল সম্রাট তথা এই আধ্যাত্মিক কবি পুরুষ। সিরাজ সাঁইয়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়ান বাংলার পথে প্রান্তরে। তাঁর হৃৎপিন্ড নিঃসৃত সব আধ্যাত্মিক মাত্রাগুলিকে কথা ও সুরে বেঁধে দিয়ে মানব প্রেমের মহান গীতিকায় ভরে তোলেন শ্যামলিমা বাংলা মায়ের বুক। ফকিরি বেশ ধারণ করে হয়ে ওঠেন লালন ফকির।
সক্রেটিস থেকে শুরু করে মোহাম্মদ প্রমূখ দার্শনিকদের কথা, কাজ ও ভাবনা নিয়ে ভাবতে গেলে – এই উপমহাদেশের শ্যামল মায়ের যে সন্তানটির কথা এসে যায়, সে ঐ লালন বৈ অন্য কেউ নয়। যার ভাবনায় ছিলো শুধু প্রেম। অসামপ্রদয়িক মানবতাবাদ মানব প্রেমের বৈশ্বিক জায়গাটি অতিক্রম করে তাঁকে নিয়ে গেছে ঈশ্বরের কাছাকাছি। ইহকালকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ভেবে নয় – বরং ইহকালের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমন্বয় ঘটিয়ে পরকাল নামক কাল্পনীক সময়ের জন্য এক অসাধারণ আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ প্রেমের স্বরলিপি রচনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। মানব জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে এক অসাধারণ উপভোগকামী বাণীতে সুর দিয়েছেন -
“অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই
শুনি মানবের উত্তম কিছু নাই
দেব-দেবতাগণ করে করে আরাধন
জন্ম নিতে এই মানবের
মন যা করো ত্বরা করো এই ভেবে,
এমন মানব জনম আর কী হবে
——————————-।”
মানব প্রেমিক, অসামপ্রদায়িক চেতনার ধারক-সাধক লালন শাহ্ তাঁর জীবৎকালে যে অসংখ্য মানবতাবাদী প্রেমময় গান রচনা করে গেছেন – এর মূলে ছিলো তাঁর বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিক দর্শন। যে দর্শন ছিলো অসামপ্রদায়িক জাত, ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বমানবতা তথা এক সীমাহীন প্রেমের দর্শন। তাঁর জাত ছিলো মানুষ আর ধর্ম ছিলো মানুষের ধর্ম তথা প্রেম। যে প্রেমের মাধ্যমে তিনি বিশ্বমানবতায় সৃষ্টি করেছেন এক অপরূপ মুরতি এবং তাকে অতিক্রম করে বা কল্পনায় তাঁকেই রূপ দিয়েছেন ঈশ্বরের মহিমায়।
লালনের দর্শন থেকে যেন বাদ পড়ে নি কিছুই; সমাজ, সংসার, সভ্যতা। এর কিছুই তাঁর চিন্তার বাইরে নয়। এমনকি প্রথাগত ধর্মকেও অত্যন্ত শৈল্পিক ভাবনায় আপন করে নিয়েছেন। যার সুর বেঁধেছেন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে। এভাবে মানবজীবনের এহেন দিক নেই, যা তাঁর হৃদয় নিংড়ানো সুরের কাছে বাঁধা পড়ে নি। অত্যন্ত সূক্ষ্ম শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় মানবতা তথা বিশ্বপ্রেমের গান গেয়ে এমন একটি দর্শনের জন্ম দিয়ে গেলেন – যার ফলে পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই আমাদের রবীন্দ্রনাথদের, যারা লালনকে পুঁজি করে শিখে নিয়েছেন কীভাবে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠা যায়।


good writing.