তারামন বিবি বীরপ্রতীক- একজন আলোকিত মুক্তিযোদ্ধা
— এস. এম. আব্রাহাম লিংকন
১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। প্রাথমিক ভাবে শহর কেন্দ্রীক সংগ্রাম হলেও সংগ্রামের আলোর বিকিরণ ভীষন ভাবে অলোড়িত করেছিল গ্রামাঞ্চলের নিরিহ নাগরিকদের। সংগ্রামের জলস্বাছ সম ঢেউ সারা দেশের ন্যয় সমগ্র কুড়িগ্রাম জেলাকে করেছিল প্লাবিত। উছলে উঠেছিল সোনাভরি নদীর উভয় পাড়।
সোনাভরি নদীর জলে স্নাত কিশোরী তারামন বিবির বাড়ী ছিল রাজিবপুর থানার শংকর মাধবপুর গ্রামে। পিতার দারিদ্র তারামন বিবির স্বপ্ন গুলোকে অংকুরেই বিনষ্ট করে। সংসারে দারিদ্র্য এতই প্রকট ছিল যে একান্ত নিরুপায় হয়ে তারামন বিবির পিতা তারামন কে পাশ্ববতর্ী গ্রামের মেছের আলী নামক এক পাগলের সাথে বিবাহ দেন। পাগল স্বামীর ঘরে তারামন বিবির সংসার সুখের হয়নি। পিতার হাত থেকে পরিত্রাণ পেলেও অভাবের হাত থেকে মুক্তি পাননি। পাগল স্বামী মাঝে মাধ্যেই নিরুদ্দেশ হতেন। এরুপ অবস্থায় তারামন বিবি স্বামীর বাড়ী থেকে পিতার বাড়ীতে ফেরৎ আসেন। তখন ১৯৭১ সাল বাঙ্গালীর জীবনে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয়েছে যৌবনের মিছিল। ‘৭১ এ যুদ্ধের শুরু হলে প্রথম থেকেই এর প্রভাব সমগ্র রৌমারী থানা এবং এর আশ-পাশে রাজিবপুর এলাকাতে ছড়িয়ে পরে। এ অঞ্চলে ইতি মধ্যেই সেনাবাহিনীর সুবেদার আলতাফের নেতৃত্বে এক প্লাটুন সৈন্য সৈয়দপুর সেনানীবাস থেকে সশস্ত্র অবস্থায় ঘোড়াঘাট হয়ে গাইবান্ধা দিয়ে পাথরের চরে এসে অবস্থান নিয়েছে। তার বাহিনীর সাথে স্থানীয তরুণ যুবা,আনছার,ইপিআর যোগদিলে প্লাটুনটি বড় আকার ধারণ করে। সুবেদার আলতাফ সমগ্র প্লাটুন নিয়ে ভারতে মানকার চরে গেলে সেখানকার বি.এস.এফ সৈন্যদের অস্ত্র জমা দিতে বললে তিনি অস্ত্র জমা না দিয়ে রৌমারী এলাকায় ফিরে -রৌমারী , যাদুর চর, রাজিবপুর, কোদালকাটি এবং ছলিপাড়ায় ক্যাম্প করেন। বিষয়টি পাক আর্মির নজরে এলে আগষ্ট মাসের দিকে পাকবাহিনী কোদালকাটিতে অবস্থান নেয়। ফলে শংকর মাধবপুর পাকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন তারামনের পরিবার আশ্রয় নেন সোনাভরি নদীর পূবৃ পাড়ে। সোনাভরি নদীর পাড়ের ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন হাবিলদার মুহিব। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রান্না করার জন্য এক লোক খুঁছিলেন। জখন জনৈক আজিজার রহমান মাস্টার তারামন বিবিকে ক্যম্পে রান্নার কাজে নিয়োজিত করেন।
তারামনেরপিছনে দারিদ্র্য তাড়া করলেও তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা, সাহসকে নড়বড়ে করতে পারেনি। ক্রমান্বয়ে তার বুদ্ধি ও সাহস কমান্ডার মুহিবকে তার সমর্্পকে আগ্রহী করে তোলে। তিনি তারামন বিবিকে গোয়েন্দা কার্যে নিযুক্ত করেন। কিশোরী তারামন পাক বাহিনীর বর্বরতার বিরুদ্ধে একাজটি লুফে নেন। তিনি কখনো পাগলী বেশে , কখনো বিকলাঙ্গ শারীরিক প্রতিবন্ধি হিসেবে ভিক্ষুক সেজে শত্রুর খবর সংগ্রহ করেছেন। এমনকি পাক আর্মির ক্যাম্পের ভেতর থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছেন। তার প্রদত্ত তথ্য পাক আর্মির বিরুদ্ধে শসশস্ত্র সংগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সফলতা দেয়। তারামন বিবি একাজের জন্য সেসময় একাধিকবার সোনাভরি নদীর সাঁতার কেটে পাড়ি দেন। তারামন বিবি কমান্ডার মুহিবের তত্তাবধানে অস্ত্র পরিচালনা শেখেন। পাকসেনারা নদী পার হতে চেষ্ঠা নিলে তা প্রতিরোধের জন্য গুলি ফুটিয়ে জবাব দেয়া হতদিতে হত। তারামন বিবিও সে সকল অপারেশনে অংশ নেন। সম্মুখে থেকে গুলির জবাব দিতেন। তার এ সকল কার্য সমর্্পকে কমান্ডার মুহিব উচ্চ পর্যায়ে তার সমর্্পকে গোপন প্রতিবেদন দেন। দেশ স্বাধীন হলে দাখিলী প্রতিবেদন বিবেচনায় সরকার তারামন বিবিকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করেন। কিন্তু কমান্ডার মুহিবের প্রতিবেদনে তারামন বিবির ঠিকানা উল্লেখ না থাকায় তারামনের খেতাব প্রাপ্তির বিষয়টি অগোচরে থেকে যায়। খেতাব প্রাপ্তির তথ্যটি প্রথম খঁজে বের করেন ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন করেজের বাংলার শিক্ষক বিমল কান্তি দে। তিনি রাজিবপুর কলেজের অধ্যাপক আব্দুস সবুর ফারুকী ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই এর সহযোগিতায় তারামন বিবির অবস্থান নিশ্চিত হন বলা যায় একপ্রকার উদ্ধার করেন। উক্ত সুত্র ধরে কুড়িগ্রামের অধূনা লুপ্ত সাপ্তাহিক গণকথা পত্রিকায় ৭ ই নভেম্বর /৯৫ তারিখে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে এর পরে কুড়িগ্রাম এর তৎকালীন সাংবাদিক গণ জাতীয় পত্রিকায় তারামনের খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করেন। এর ফলে দেশ ব্যাপী তারামন বিবিকে নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর পর সরকার প্রাপ্য খেতাব তারামন বিবির হাতে তুলে দেন।
তারামন বিবি বীরপ্রতীক দু‘জন খেতাবধারী নারী মুক্তিযোদ্ধার একজন। তিনি কুড়িগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ নাগরিকদের একজন দেশের একজন আলোকিত নারী মুক্তিযোদ্ধা।

