অসাম্প্রদায়িক ভাবনা এবং ড. হুমায়ুন আজাদ
— এস. এম. আব্রাহাম লিংকন
স্বাধীনতা উত্তোর বাংলাদেশে যে কজ‘ন বাঙ্গালী সাহিত্যিক কথা ও চলায় সাহসী, জীবন প্রনালীতে ধর্মনিরপেক্ষ এবং কট্টর দেশপ্রেমিক তাদের মধ্যে সম্ভবত প্রধান হবেন ড. হুমায়য়ুন আজাদ। রাজন্যবর্গের আনুকল্যের জন্য প্রচলিত পথে তিনি পরিভ্রমন করেননি। তার কপলে অন্যদের মত রাজ তিলক উঠেনি। দেশে প্রচলিত সাহিত্যিকরা অনেকেই গোত্র ভিত্তিক পরিচয়ে পুলক অনুভব করেন। প্রচলিত রাজন্যবর্গের বিচারে দেশে কে কোন ঘরানার তার উপর নির্ভর করে সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের মূল্যমান। ড. হুমায়ুন আজাদ বাংলাদেশে প্রচলিত ঘরানা বিরোধী সৃজনশীল সংগ্রামী লেখক ছিলেন। তিনি ডান, বাম বা মধ্য নামের কোন পথের সাথে মিলে যাননি। বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। ফলে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল সকল মত এবং পথের ত্রুটি নিয়ে নির্জলা সমালোচনা করার। তিনি একজন বিশুদ্ধ সমালোচক, সাহসী সাহিত্যিক।
বাংলাদেশে তিরিশ লক্ষ শহীদের স্বপ্ন ভঙ্গের প্রধান আসামী মৌলবাদ । গদির বাঁধনকে শক্ত করতে দেশে ধর্ম নিরপেক্ষতার মাথায় টুপী চাপিয়েছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করে সংবিধানের সুন্নতে খাতনা করেছেন লেঃ জেঃ হোসেইন মোহম্মদ এরশাদ। সবই রাজনীতির নামে। একটি দেশের পরিচালক হচ্ছেন রাজনীতিবিদ। রাজনীতিবিদ ছাড়া কোন রাষ্ট্র কল্পনা করা যায়না। এই তো ক‘দিন আগে দেশে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদের উপর রাজ্যের সকল দোষ চাপিয়ে নিজেদের মহান করার চেষ্টা করলেন ফকরুদ্দিন সাহেবেরা। অবশ্য পার পাননি। ব্যক্তি রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার বিকৃত মোহ আজ বিশ্বব্যাপী জনগনের জন্য কাল হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকরা রাজনীতিবিদদের নগ্নতায় বেশ আতঙ্কিত। রাজনীতিতে দর্শনের আলোচনা নেই, নীতি নৈতিকতা বোধ তিরোহীত । ব্যক্তি পূঁজা আর পারস্পরিক গিবদ রাজনৈতিক কর্মীদের প্রধান কর্ম। ভাল মন্দ বিচার করার ক্ষমতা দলের কর্মীরা ধারণ করেন না। ধর্মে যেমন পীর মাশায়েখদের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নৈকট্য লাভের প্রধান বাহন, অনুরূপ আধুনিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একজন কর্মী বিনা বাক্যে নেতার অনুসারী না হলে তার সাফল্য সুদূরপরাহত। রাজনীতির এহেন চিত্র তাকে ভীষন ভাবে ব্যাথিত করেছিল। তিনি রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেননা তবে বর্তমান রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে বলেছেন- রাজনীতিবিদরা মেতে উঠেছে বিশ্বাস ও মিথ্যের প্রতিযোগিতায় ; তারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিকর মানব গোত্র।
তিনি সাহিত্যের মানুষ কিন্তু সাহিত্য যেহেতু মানুষের সামগ্রীক বিষয়বস্তুর সাথে সমর্্পকিত সেহেতু তিনি সমাজ ধর্ম রাষ্ট্র রাজনীতি দর্শন সব কিছুই নিয়ে ভেবেছেন, গবেষণা করে সহজ সাবলিল ভঙ্গিতে তা উপস্থাপনও করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি বিবেচনা করেননি ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের খড়গের কথা, রাজনীতিবিদদের উদ্ধত হুঙ্কারের কথা। তিনি তার ধর্ম বিষয়ক নিবন্ধে লিখেছেন মানুষ মর্ম মূলে ধর্ম বিরোধী বলেছেন ধার্মিক মানুষ অসুস্থ মানুষ। তার ধারনা আগামী দু-এক শতকের মধ্যেই মানুষ মুক্ত হবে ধর্মের কবল থেকে , তার মতে ধর্মের প্রধান ক্ষতিকর দিক হচ্ছে ধর্ম বিভেদ সৃষ্টি করে; মানুষকে বিভিন্ন গোত্রে ভাগ করে দেয়, সৃষ্টি করে পারস্পরিক ঘৃণা, বিদ্বেষ,শত্রুতা এ ক্ষেত্রে তিনি বাট্রান্ড রাসেল এর ” আমি কেন খ্রীস্টান নই বইকে উদ্ধৃত করেছেন। তার এ বক্তব্য ধর্মাশ্রয়ীদের ভিতরে বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্য হয়তো যথেষ্ট অবকাশ পেয়েছে। তবে এ কথাও তো সত্য আমাদের ধমীয় নেতারা ধর্মকে ‘৭১ সালে পাকিস্তানীদের পক্ষালম্বন করতে ব্যবহার করেছেন। এখন চলছে ভারত বিরোধী কাজে ধর্মের ব্যবহার বিশেষত ইসলাম ধর্মের ব্যবহার। ইসলামের নামে কত কত রাজনৈতিক দল, সেসব দলের আবার কত বিরোধ তার ইয়াত্তা নেই। পাকিস্তানে প্রায় প্রতিদিনই মুসলমান নিধন হচ্ছে । মুসলিম ধর্মালম্বিদের নিরপাদ স্থান মসজিদ আক্রমন করে শত শত মুছলি্ল হত্যার মহোৎসবে মেতে উঠছে কোন এক মুসলিম দল বা ব্যক্তি। কোন নাস্তিক বা অন্য কোন ধর্মের লোক এগুলো করছেনা। ধর্মের নামে মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞের মত কর্মে অংশ গ্রহণ মুসলমান হিসেবেই শুধু নয় মানুষ হিসেবে তার এ আচরন অসুস্থতার বর্হিপ্রকাশ মাত্র।
আমরা আমাদের এই উপমাহদেশের দিকে যদি তাকাই দেখতে পাবো আফগানিস্তানে বারবাক কামালের নেতর্ৃত্বে সাউর বিপ্লবের পর ধূরন্ধর আমিরিকার নেতর্ৃত্বে তালেবানী জাগরণ সাময়িক ভাবে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হলেও আজ তালেবানী যন্ত্রনায় সমগ্র বিশ্ব বিপর্যস্ত এমনকি স্বয়ং তালেবানী স্রস্টা এমিরিকার উঠেছে নাভিশ্বাস। সোয়াতের সৌন্দর্য তালেবানী হামলায় ধ্বংস। পাকিস্তান বিভাজনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশেও তালেবানী মন্ত্রে ধমর্ীয় উন্মাদনার ঢেউ আর মৌলবাদের হুঙ্কার জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে উদ্যত। বাংলা ভাই ইংরেজী ভাইদের তাগুদি লড়াই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই মোহাম্মদ বিন কাসিমের যুগে যেন গায়ের জোড় দিয়ে সবাইকে মুছলমান বানিয়ে দেবে। দেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয় থাকবেনা সবাই পড়বে মাদ্রাসায়।
ড. হুমায়ুন আজাদ নিজেকে নাস্তিক বলতে ভালবাসতেন, তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না । কমিউনিস্টদের লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে কখনও বক্তব্য দিতে দেখিনি। ৪৭ এ ধর্ম যখন ভারতকে ভাগ করেছিল সেদিন আমাদের কমিউনিস্টরা ধর্ম এবং পরাধীনতার উভয়েরই বিরুদ্ধে তেজস্বী ছিলেন। অনেক কমিউনিস্ট সাম্পদায়িক হননে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তখন ঘোর অমানিসার কাল ছিল। আজ গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার যুগে কমিউনিস্টরা বহু ধারায় বিভাজিত। আমাদের কমিউনিস্টরা যখন ক্রমান্বয়ে ধর্মাশ্রয়ী তখন হুমায়ুন আজাদের মত সাহসী নাগরিক একাই করেছেন সকল ধর্ম এবং ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। হয়তো সে কারণেই তাকে সোমেন চন্দের মত অকাল পরিণতিকে বরণ করতে হয়েছিল।
ড. হুমায়ুন আজাদ এরুপ ধর্ম এবং তথাকথিত ধর্মান্ধদের অবস্থান নিয়ে নানা সময়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষন করেছেন যা একটি বিজ্ঞান মনষ্ক জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য।
রাষ্ট্রের নবীণ নাগরিকদের যে ভাবে পারলৌকিক প্রলোভনে সশস্ত্র অবস্থান নিতে উদ্বুদ্ধ করছে ধমর্ীয় মৌলবাদ। সেখান থেকে বেড়িয়ে আসার পথ হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষ বিজ্ঞান ভিত্তিক জীবন চর্চা। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুলতে হবে পাঠচক্র যেখানে ড. হুমায়ুন আজাদের আমার অবিশ্বাস গ্রন্থটি সহ তার সকল রচনা সমগ্র মৌলিক ভূমিকা রাখতে পারে।
আমি মনে করি আমাদের প্রজন্ম এক মহা সংকটে আবর্তিত । এখানে মাদক আর মৌলবাদ সমগ্র জাতির অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। রাষ্ট্রিয় উদ্যেগের অপেক্ষায় না থেকে যে যেখানে আছি সেখান থেকেই ভূমিকা রাখতে উদ্যেগী হতে হবে। নতুবা একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখবো আমার প্রিয় সন্তান মৌলবাদের বেড়াজালে আবদ্ধ । ব্রিটিশ বিরোধী যুগে গৃহে মায়েরা পাঠশালায় গুরুজনরা দেশপ্রেম শিখিয়েছেন। উদ্বুদ্ধ করেছেন তার প্রিয় সন্তানকে দেশের জন্য তৈরী হতে। মায়ের আর শিক্ষকের আদর্শে সেদিন তরুণেরা দেশের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিল। আজকেও জরুরী হয়ে পরেছে আমাদের মায়েদের ভূমিকা তার প্রিয় সন্তানকে মানুষ হিসেবে বিকশিত করার জন্য। খুবই প্রয়োজন হয়ে পরেছে পাঠশালায় শিক্ষকের ভূমিকার। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি পনের কোটি লোকের বাস কিন্তু ক‘জন মানুষ আছে। হুমায়ুন আজাদ এর মত অজস্র প্রতিভাবান মানুষ হয়তো আমরা পাবনা কিন্তু তার প্রত্যাশিত পথে চলতে পারলে আমরা সকলে একদিন মানুষ হয়ে যাব।


Excellent writing sir. I have taken the article for Munshigonj.com and given the source name respectably.